ব্রেকিং নিউজ :
লাইভ নিউজ
বাংলা:
হিজরি:
English:
নিউ সাউথ বাংলা
বিনোদন

গ্রামের নাম শুনেই ভেঙে যায় বিয়ের সম্পর্ক

সাউথ বাংলা ডেস্ক জাতীয়
আপডেট: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৬ বিকাল
গ্রামের নাম শুনেই ভেঙে যায় বিয়ের সম্পর্ক

হেরোইনপল্লি’ অপবাদের চার দশক: কবে ফিরবে রাইগ্রামের স্বাভাবিক দিন?

“আপনার বাড়ি কোথায়?”—খুবই সাধারণ একটি প্রশ্ন। কিন্তু গাইবান্ধার পলাশবাড়ী পৌরসভার রাইগ্রামের তরুণ-তরুণীদের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যেন এক বিরাট অস্বস্তির বিষয়। গ্রামের নাম মুখে আনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বহু বছরের এক কুখ্যাত তকমা—‘হেরোইনপল্লি’।

দীর্ঘ চার দশক ধরে চলা মাদক কারবারের কারণে পুরো গ্রামের ওপর লেপে দেওয়া হয়েছে এই অপবাদ। কয়েকজনের অপরাধের খেসারত দিতে হচ্ছে হাজারো নিরীহ মানুষকে।

সামাজিক বঞ্চনা ও মানসিক যন্ত্রণা

পলাশবাড়ী পৌরসভা থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাইগ্রাম। বাইরে থেকে দেখলে এটি উত্তরাঞ্চলের সাধারণ দশটা গ্রামের মতোই শান্ত। কিন্তু আড়ালে এটি মাদকের একটি বড় সিন্ডিকেটের কেন্দ্রস্থল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৪০ বছর আগে আবদুল জব্বার নামের এক ব্যক্তির হাত ধরে এখানে মাদকের গোড়াপত্তন হয়। কালক্রমে তা বিস্তার লাভ করে ফেনসিডিল, গাঁজা এবং হেরোইন কেনাবেচার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়।

এই কুখ্যাত পরিচয়ের সবচেয়ে বড় শিকার গ্রামের নির্দোষ ও উদীয়মান তরুণ-তরুণীরা:

বিয়ে ও সামাজিক সম্পর্কে বাধা: গ্রামের নাম শুনলেই অনেক পরিবার ছেলে-মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। ভেঙে যায় অনেক সম্ভাবনাময় সম্পর্ক।

শিক্ষার্থীদের সংকোচ: স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা সহপাঠীদের কাছে নিজের গ্রামের পরিচয় দিতে বিব্রত বোধ করে।

চাকরি ও কর্মক্ষেত্রে অপমান: কর্মক্ষেত্র কিংবা সাধারণ সামাজিক যোগাযোগের জায়গায় গ্রামের মানুষকে বহন করতে হয় অন্যায্য এক অপরাধবোধ।

আইনের ফাঁক ও স্থানীয়দের হতাশা

গ্রামবাসীর বড় আক্ষেপ, মাদক কারবারিদের দাপট এতটাই বেশি যে কেউ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পান না। অতীতে যারা মুখ খুলেছেন, তাদের হুমকি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধার করলেও কিছুদিন পর আসামিরা জামিনে বেরিয়ে আবার একই চক্রে যুক্ত হয়। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদকসেবী ও কারবারিদের আনাগোনা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

স্থায়ী সমাধানের আকুতি

গ্রামবাসী মনে করেন, রাইগ্রামকে মাদকমুক্ত করার এখনই উপযুক্ত সময়। কেবল সাময়িক গ্রেপ্তার নয়, বরং— ১. মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. যারা অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

গাইবান্ধা জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, রাইগ্রামে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে এবং জনসচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শরীফ আল রাজীব বলেন, “শুধু পুলিশের পক্ষে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”

গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কাওছার মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম লেবু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা এবং মাদকাসক্তদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর নানা উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চার দশকের অভিশাপ কাটিয়ে রাইগ্রামের সাধারণ মানুষ আজ শুধু একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ চায়। তারা চায় ‘হেরোইনপল্লি’ নয়—রাইগ্রাম আবার নিজের আসল পরিচয়ে ফিরে আসুক।

দেশ ও দেশের বাইরের এমন বস্তুনিষ্ঠ এবং অনুসন্ধানী খবর সবার আগে পেতে নিউ সাউথ বাংলা-এর সাথেই থাকুন।

নিউ সাউথ বাংলা — সত্যের পক্ষে, সোচ্চার সবসময়।