ব্রেকিং নিউজ :
লাইভ নিউজ
বাংলা:
হিজরি:
English:
নিউ সাউথ বাংলা
ইসলাম ও জীবন

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নির্দেশনা

সাউথ বাংলা ডেস্ক জাতীয়
আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৯ দুপুর
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামে ন্যায়বিচার ও ইনসাফ: সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি

ন্যায়বিচার ইসলামের অন্যতম মৌলিক ও অবিচ্ছেদ্য নীতি। ইসলাম এমন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রে কঠোরভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ইসলামে ন্যায়বিচার শুধু একজন বিচারকের আদালতের দায়িত্ব নয়; বরং এটি প্রত্যেক মুসলিমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের বারবার এই শিক্ষাই দেয় যে, ন্যায়ের প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস চলবে না; তা হোক নিজের স্বার্থে, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু কিংবা কোনো প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। একজন প্রকৃত মুমিনের মূল পরিচয় হলো, তিনি সব পরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেবেন।

১. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সরাসরি আল্লাহর নির্দেশ

মানবসমাজে ইনসাফ কায়েম করা আল্লাহর পরম নির্দেশ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِاحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।" (সূরা আন-নাহল: ৯০)

এই আয়াতটি ইসলামে সামাজিক সুশাসনের অন্যতম মূল ভিত্তি। আল্লাহ তাআলা এখানে সর্বপ্রথম ন্যায়বিচারের কথা বলেছেন, যা প্রমাণ করে যে একটি শান্তিময় ও কল্যাণকর সমাজ গঠনের প্রথম শর্তই হলো ইনসাফ।

২. নিজের বা আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায়ের সাক্ষ্য দিতে হবে

ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইসলাম সম্পর্কের মোহ বা স্বজনপ্রীতিকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلوْ عَلَىٰ أَنْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالأَقْرَبِينَ ۚ إِنْ يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَنْ تَعْدِلُوا

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো এবং আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। সে ধনী হোক বা দরিদ্র, আল্লাহই তাদের ব্যাপারে অধিক হকদার। সুতরাং ন্যায়বিচার করতে গিয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না।" (সূরা আন-নিসা: ১৩৫)

এই আয়াতটি ইসলামের ইনসাফের সর্বোচ্চ মানদণ্ড তুলে ধরে। এখানে পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে যে, ন্যায়ের প্রশ্নে নিজের স্বার্থ, পারিবারিক বন্ধন বা সামাজিক মর্যাদা কোনো কিছুই প্রতিবন্ধক হতে পারবে না।

৩. শত্রুর প্রতিও করা যাবে না অন্যায়

ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত শত্রুতার জেরে কারও প্রতি অবিচার করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন:

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায়ের সাক্ষ্যদাতা হয়ে দাঁড়াও। কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি তোমাদের বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করতে প্ররোচিত না করে। তোমরা ন্যায়বিচার কর; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী।" (সূরা আল-মায়িদা: ৮)

শত্রুর প্রতিও সুবিচার করার এই বৈপ্লবিক শিক্ষা একমাত্র ইসলামই মানবজাতিকে দিয়েছে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে ন্যায়বিচারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পুরো জীবনে ইনসাফের এক অনুপম আদর্শ স্থাপন করে গেছেন। একবার কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত ও প্রভাবশালী পরিবারের নারী চুরির অপরাধে অভিযুক্ত হলে, তার বংশমর্যাদার কথা বিবেচনা করে কতিপয় লোক শাস্তি মওকুফের সুপারিশ করতে চায়। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর কণ্ঠে ঘোষণা করেন:

وَايْمُ اللَّهِ، لَوْ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ مُحَمَّدٍ سَرَقَتْ لَقَطَعْتُ يَدَهَا

"আল্লাহর শপথ! যদি মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও চুরি করত, তবে আমি তার হাত কেটে দিতাম।" (সহিহ বুখারি: ৩৪৭৫; সহিহ মুসলিম: ১৬৮৮)

এই ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে, ইসলামের আইনের দৃষ্টিতে ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা সবাই সমান। ক্ষমতা বা উচ্চ বংশমর্যাদা কাউকে অপরাধের শাস্তি থেকে রেহাই দিতে পারে না।

বিচারকার্যে কঠোর সতর্কতা ও জবাবদিহিতা

বিচারকের আসন অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ এবং এ নিয়ে পরকালে জবাবদিহিতা অনেক কঠিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচারকদের সতর্ক করে বলেছেন:

"বিচারক তিন প্রকার। একজন জান্নাতে এবং দুজন জাহান্নামে। যে ব্যক্তি সত্য জেনে সে অনুযায়ী বিচার করে, সে জান্নাতে যাবে। আর যে ব্যক্তি সত্য জেনেও অন্যায় বিচার করে এবং যে ব্যক্তি অজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার করে, তারা জাহান্নামে যাবে।" (সুনান আবি দাউদ: ৩৫৭৩; সুনানুত তিরমিজি: ১৩২২)

উপসংহার

একটি সমাজে যখন প্রকৃত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সাধারণ মানুষের অধিকার সংরক্ষিত হয়, দুর্নীতি ও জুলুমের অবসান ঘটে এবং পারস্পরিক শান্তি ও বিশ্বাস সুদৃঢ় হয়। বিপরীতে, সমাজে ইনসাফ না থাকলে বিশৃঙ্খলা এবং জুলুমের জন্ম হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রকে সুন্দর ও নিরাপদ করতে আমাদের প্রত্যেকের জীবনে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর এই মহান শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি।

ইসলামের সুন্দর আদর্শ, ধর্মীয় আলোচনা ও দেশ-বিদেশের সব ব্রেকিং নিউজ সবার আগে পেতে ‘নিউ সাউথ বাংলা’র সাথেই থাকুন।